২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের সরকারি-বেসরকারি মেডিকেল কলেজের ভর্তি পরীক্ষায় ১১৭তম হয়েছেন আল আমিন। ২০০ নম্বরের মধ্যে ১৮৬ দশমিক ২৫ নম্বর পেয়ে ঢাকা মেডিকেলে ভর্তির জন্য মনোনীত হয়েছেন।
আল আমিন পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার আদাবাড়িয়া ইউনিয়নের মাধবপুর গ্রামের মো. নিজাম উদ্দিন হাওলাদার ও নাজমা বেগম দম্পতির দ্বিতীয় ছেলে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আল আমিনের বাবা নিজাম উদ্দিন হাওলাদারের বসতভিটা ছাড়া আর কিছুই নেই। বাড়ির কাছে ছোট একটি কক্ষ ভাড়া নিয়ে খাবার বিক্রি করেন। পাশাপাশি অন্যের জমিতে কৃষিকাজ ও গবাদিপশু পালন করেন। তার স্ত্রী নাজমা বেগম একজন গৃহিণী। এই দম্পতির তিন ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে আল আমিন দ্বিতীয়। নিজ গ্রামের মাধবপুর নিশিকান্ত মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে ২০২২ সালে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়ে পাস করেন আল আমিন। এরপর বরিশাল সরকারি কলেজে ভর্তি হন। কিন্তু অর্থের অভাবে বাড়িতে বসে প্রায় এক বছর বাবার সঙ্গে নিয়মিত হোটেলে কাজ করেছেন এবং মুঠোফোনের মাধ্যমে অনলাইনে ক্লাস করেছেন। এখন মেডিকেলে ভর্তির খবরে স্থানীয় লোকজন, শিক্ষক, স্বজন ও শুভানুধ্যায়ীরা অনেকেই ফুল নিয়ে বাড়িতে এসে শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন। চলছে মিষ্টিমুখ।
আল-আমিনের বাবা নিজাম উদ্দিন হাওলাদার বলেন, ছেলেকে মানুষের মতো মানুষ করতে গভীর রাত পর্যন্ত হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করেছি। ছেলেকে টাকার কষ্ট বুঝতে দিতে চাইনি। ছেলে মেডিকেলে চান্স পাওয়ায় আমি অনেক আনন্দিত, আমার পরিশ্রম বিফলে যায়নি। আল আমিন সুযোগ পেলে সবসময় আমার কাজে সহযোগিতা করতো। পুরি, শিঙাড়া ও সমুচা বানিয়েছে, ভাত বিক্রি করেছে, দোকানের জন্য পানি এনেছে।
আল-আমিনের মা নাজমা বেগম বলেন, ছোটবেলা থেকে যা বলতাম তাই করতো আল আমিন। সে অনেক কষ্ট করে পড়ালেখা করেছে। বাবার সঙ্গে সংসারের কাজ করেছে, স্কুলেও গেছে। আমরা ঠিকভাবে ভালো খাবার পর্যন্ত দিতে পারিনি। আমি চাই আমার ছেলে গ্রামের সবার সেবা করুক। অনেকে টাকার অভাবে চিকিৎসা করতে পারে না, আমার ছেলে সেই সকল মানুষের পাশে দাঁড়াবে।
আল আমিন বলেন, আমার এই সফলতার পেছনের মূল সাহস ও অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে আমার পরিবার। বিশেষ করে আমার বাবা-মা। তারা আর্থিকভাবে অসচ্ছল থাকার পরও আমার লেখাপড়ার খরচ সঠিকভাবে চালিয়েছে। তারা অনেক বাধার সম্মুখীন হওয়া সত্ত্বেও আমার প্রতি কখনো কোনো অযত্ন করেনি।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে যে মেডিকেল সেক্টর রয়েছে সেখানে নিম্নবিত্ত ও উচ্চবিত্তদের মধ্যে বিরাট বৈষম্য রয়েছে। আমি এই বৈষম্য কমিয়ে আনতে চাই। সবাইকে সমান সুযোগ-সুবিধা দেওয়া এবং সঠিক চিকিৎসা দেওয়া আমার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা।
আল আমিন বলেন, আমরা চার ভাই-বোন সবাই লেখাপড়া করি। সুতরাং সেখানে খরচ আছে। আমার বাবা দোকানের পাশাপাশি কৃষিকাজ করেন। বাবা কৃষিকাজে মাঠে থাকাকালে আমিই দোকান পরিচালনা করতাম, যাতে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে না হয়। বাবার যেভাবে সহযোগিতা দরকার ছিল আমি সেভাবেই সহযোগিতা করার চেষ্টা করেছি। বাবার কাজকে কখনো আমি ছোট করে দেখিনি। আমার কখনো মনে হয়নি এটা কেন করছি, কারণ এটা আমার দায়িত্ব।
এলাকাবাসী বলেন, ছোটবেলা থেকেই অভাবের সংসার। আর্থিক অভাবের কারণে বাড়িতে থেকে অনলাইনে ক্লাস করেছে আল আমিন। এরকম ভদ্র ও বিনয়ী স্বভাবের ভালো ছেলে বর্তমানে পাওয়া মুশকিল। ওর মধ্যে হিংসা ও অহংকারের লেশমাত্র নেই। তার এমন ভালো ফলাফলে শুধু তার বাবা ও মা নয়, গোটা এলাকার মানুষ আনন্দিত ও গর্বিত।
মাধবপুর নিশিকান্ত মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জয়দেব চন্দ্র শিকারী বলেন, আমরা গর্বিত আমাদের বিদ্যালয়ের আল আমিন ঢাকা মেডিকেল কলেজে চান্স পেয়েছে। আমাদের বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে আল আমিনকে অভিনন্দন জানিয়েছি। স্কুল জীবন থেকেই দেখতাম আল আমিন লেখাপড়ায় অনেক মনোযোগী। ক্লাসে তীর্থের কাকের মতো স্যারদের অনুসরণ করতো। আর্থিক অভাবের কারণে আল আমিনের লেখাপড়ায় একটু ব্যাঘাত ঘটেছে। আমি স্রষ্টার কাছে প্রার্থনা করি আল আমিন যেন ভালো একজন ডাক্তার হয়ে পরিবারের মুখ উজ্জ্বল করতে পারে। দেশের চিকিৎসাশাস্ত্রে যেন অনেক বড় অবদান রাখতে পারে।